ঢাকা শুক্রবার, ১৪ই মে ২০২১, ৩১শে বৈশাখ ১৪২৮


ভোলাহাটে চরকায় সূতা কেটে কোন রকমে চলছে বিধবা হারানি ও মেয়ের সংসার- কপালে জুটেনি সরকারি সুবিধা


প্রকাশিত:
৩ মে ২০২১ ১৬:৩৭

আপডেট:
১৪ মে ২০২১ ০৪:৩৮

নিজস্ব প্রতিবেদক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ : কুঁড়ে ঘর। বসবাস করেন বিধবা মা আর তালাক প্রাপ্ত মেয়ে। পরিবারটিতে আয় করার কেউ নেই। বিধবা মা হারানি পাড়ায় পাড়ায় ভিক্ষা করেন। কখনো মানুষের বাড়ীতে কাজ করেন। সময় পেলে চরকায় সূতা কাটেন। মেয়ে তালাক প্রাপ্ত ২ সন্তানের জননী নাসিমা বিয়ে হয়ে এক মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। তার স্বামী নিজ বোনের সাথে প্রেম করে বিয়ে করে নেন। ইসলাম ধর্মে তালাক হয়ে যাওয়ায় বিধবা মায়ের কুঁড়ে ঘরে আশ্রয় হয় নাসিমার। তার জীবন চলে মায়ের ভিক্ষা করা আয় দিয়ে।

অন্যের বাড়ীতে কাজ আর চরকায় সূতা কেটে কোন রকম চলে মা-মেয়ের সংসার। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলার গোহালবাড়ী হাটের পাশে মৃত. টুলুর বিধবা স্ত্রী হারানী ও তালাক প্রাপ্ত মেয়ের দেখা মিলে কুঁড়ে ঘরের সামনে চরকার চাকা ঘুরাচ্ছেন। 

তাদের স্বপ্ন বিল্ডিং বাড়ি তৈরি করে আরাম আয়েশ করার জন্য না। তিন বেলা না হলেও এক বেলা পেট ভরে এক প্লেট ভাত খাওয়ার। অসহায় মা-মেয়ের এ দৃশ্য দেখে চমকে অপলক তাকিয়ে প্রশ্ন করতেই আজকের পত্রিকাকে মেয়ে নাসিমা বলতে লাগলেন নিজের কষ্টের কথা। 

তিনি বলেন, পাশের গ্রাম চরধরমপুর গ্রামে পারিবারিক ভাবে তার বিয়ে হয়। সংসার জীবনে এক মেয়ে এক ছেলে হয়। এমন সময় আমার আপন বোনের সাথে আমার স্বামী প্রেমে জড়িয়ে পড়ে দু’জন দু’জনকে বিয়ে করে নেয়। ধর্ম মতে আমার তালাক হলে চলে আসি আমার বিধবা মায়ের কুঁড়ে ঘরে। ঘরনেই খাবার নেই। আমার মা নিজেই ভিক্ষা করে খায় কি ভাবে কি করি এমন চিন্তা করতে থাকি। 

এক সময় আমার মায়ের একটি চরকা ছিলো। ভিক্ষা করে আসার পর মানুষের বাড়ী কাজ করে। সময় পেলে চারকা কাটে এমন দেখতে দেখতে আমিও মানুষের বাড়ী কাজ করি খায়। এক সময় মা-মেয়ে দু’জন মিলে দুটো চরকায় সুতা কাটতাম। পেতাম মাসে ৯০০ থেকে ১ হাজার। কোন রকম চলে যেত সংসার। কিন্তু এখন চরকায় সূতা কাটা হয় না। যারা পরিত্যক্ত রেশম গুঠি বাড়িতে বাড়িতে দিয়ে যেত তারা এখন সূতার দাম তেমন দেন না। 

মাসে ৫ থেকে ৬০০ টাকার সূতা সংগ্রহণ করি চরকা চালিয়ে। মা-মেয়ে মাসে ১ হাজার বা ১ হাজার ২০০টাকা মত আয় হয়। এ আয়ে খাওয়া হলে পরার কাপড়-চুপড় হয় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাড়ী দিচ্ছে, চাল দিচ্ছে, টাকা দিচ্ছে কিন্তু আমাদের মত অসহায় মানুষের কপালে কিছুই জুটে না। ভালো ভালো মানুষকে শেখ হাসিনার বাড়ি দিয়েছে মেম্বার। আমার কাছে মেম্বার কামাল উদ্দিন টাকা চেয়েছিল। দিতে না পারায় বাড়ী দেয়নি। আমার মায়ের বিধবা ভাতা, ভিজিডি কার্ড, ১ কেজির ভিজিডি চালও দেয়নি।

এখন পর্যন্ত সরকারের কোন সাহায্য তারা পায়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নাসিমা। নাসিমার বিধবা মা হারানী বলেন, বিধবা ভাতার জন্য কামাল মেম্বারকে বলতে গেলে ৩ হাজার টাকা চেয়ে ছিলো। ভিক্ষা করে খায় কি ভাবে টাকা দিবো। টাকা দিতে পারিনি বিধবা ভাতাও হয়নি। সরকার অনেক দিচ্ছে কিন্তু আমার কপালে কিছুই জুটে না। 

যারা মেম্বারকে টাকা দিচ্ছে তারাই সব পাচ্ছে বলে কেঁদে ফেলেন বিধবা ভিক্ষুক হারানী। নাসিমা ও হারানীর প্রতিবেশী শহীদুল ইসলাম বলেন, অসহায় পরিবারটি ভিক্ষা, পরের বাড়ী কাজ আর চরকা কেটে কোন রকম বিধবা মা ও তালাক প্রাপ্ত মেয়ে কুঁড়ে ঘরে বসবাস করে আসছে। এত কষ্টে থাকার পরও পরিবারটিকে গোহালবাড়ী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড মেম্বার কামাল উদ্দিন টাকা না পাওয়ার কারণে এখন পর্যন্ত সরকারী কোন সুযোগ-সুবিধা দেয়নি। 

পরিবারটি এতো অসহায় টাকা-পয়সা দেয়ার ক্ষমতা নেই। মাঝে মাঝে আমার বাড়িতে কাজ করে বলে জানান। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ নুর বলেন, পরিবারটি খুব অসহায়। সরকারি যে কোন সুযোগ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলে জানান।

ওয়ার্ড মেম্বার কামাল উদ্দিন বলেন, পরিবারটি সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। এত দিন অসহায় পরিবারটি কেন কোন সুযোগ পেলেন না এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান। এবার সুযোগ আসলে ব্যবস্থা করবো বলে জানান। গোহালবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের বলেন, যারা পাওয়ার যোগ্য তাদের অবশ্য সরকারি সুযোগ দিতে হবে বলে জানান।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: