ঢাকা শুক্রবার, ১৪ই মে ২০২১, ৩১শে বৈশাখ ১৪২৮


শ্রমবাজার সুরক্ষায় ইপিএস কর্মীদের আর্তনাদ


প্রকাশিত:
২৯ এপ্রিল ২০২১ ১৭:১৮

আপডেট:
২৯ এপ্রিল ২০২১ ১৭:২৬

নিউজ ডেস্কঃ শ্রমবাজার সুরক্ষায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ দূতাবাস সিউল। দেশটিতে বিভিন্ন শিল্প কলকারখানায় কর্মরত প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি। রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম শ্রমিকদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে।

কোভিড পরিস্থিতিতে গত বছর ২৩ জুন প্রথমবার নিষেধাজ্ঞার পর বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সিউলে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস শুরু থেকেই এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোরিয়া সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপকালে বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর আরোপিত এ ভিসা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বিশেষ অনুরোধ জানান।

এছাড়া ঢাকায় নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত লি জেন কিউনের সঙ্গে বৈঠক করে বিষয়টি সমাধানের তাগিদ দেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনও।

এদিকে ভবিষ্যতে এ ধরনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার পুনরাবৃত্তি এড়াতে দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্য যে কোনো দেশে ভ্রমণেচ্ছু বাংলাদেশি নাগরিক ও সংশ্লিষ্ট সকলকে স্বাস্থ্য ও ভ্রমণবিধি যথাযথভাবে মেনে চলার মাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ করার অনুরোধ জানিয়েছে পররাষ্ট মন্ত্রণালয়।

উল্লেখ্য, গেল বছরের ফেব্রুয়ারিতে কোরিয়ায় যখন করোনার প্রভাব বাড়তে থাকে তখন নানা সমস্যার কারণে অনেকেই ছুটিতে ভয়ে পালিয়ে গিয়ে নিজ দেশে আটকে পড়েন। তাদের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার।

সে সময় দেশে আটকে পড়াদের ফেরাতে কোরিয়ায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম ও বাংলাদেশ দূতাবাস ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত মে মাস থেকে দ্বিতীয় নিষেধাজ্ঞার আগ পর্যন্ত প্রায় ৮০০ জন ইপিএস (এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম) কর্মী কোরিয়ায় ফিরে যান।

একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদিশিক মন্ত্রণালয়, বোয়েসেল ও সিউলস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় ইপিএস কর্মীরা কোরিয়ায় আসতে সমর্থ হয়। কিন্তু বাংলাদেশে অবস্থানরত রি-এন্ট্রির সুযোগ পাওয়া কমিটেড কর্মীদের দক্ষিণ কোরিয়ায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সিউলস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ও রাষ্ট্রদূত কোরিয়ার সংশ্লিষ্ট দফতরে বারবার বৈঠক করেন।

একই সঙ্গে চিঠি দিয়ে সর্বাত্মক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। যে বিষয়টি সামনে এসেছে, প্রথম নিষেধাজ্ঞার পর কোরিয়ার সার্বিক পরিস্থিতি ঢাকাকে অবহিত করে বাংলাদেশ দূতাবাস সিউল ও রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম।

সূত্র নিশ্চিত করেছে, রাষ্ট্রদূত নিষেধাজ্ঞা এড়াতে নানা পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলে ঢাকাকে পরামর্শ দিয়েছে। রাষ্ট্রদূতের সুপারিশের সঙ্গে সবাই একমত হয়েছিলেন। বলাবাহুল্য, কোরিয়ার শ্রমবাজার ধরে রাখতে এই বিষয়ে যার সারাংশ উঠে এসেছে গত ১২ এপ্রিলের আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে।

আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও সেটা তাৎক্ষণিকভাবে জানানোর তাগিদ অনুভব করেনি মন্ত্রণালয় কিংবা বোয়েসেল। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার চারদিন পর ২০ এপ্রিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য করোনা প্রতিরোধে তাদের কিছু ‘গুরুত্বপূর্ণ’ সিদ্ধান্তের কথা জানায়।

আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্তগুলো হচ্ছেঃ

(ক) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা ও বোয়েসেলের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়াগামী যাত্রীকে কোভিড টেস্ট সম্পন্ন করে ৭ দিনের বাধ্যতামূলক সঙ্গনিরোধ সম্পন্ন করতে হবে।

(খ) সাতদিনের সঙ্গনিরোধ থাকা অবস্থায় কোভিড টেস্ট শতভাগ নিশ্চয়তার স্বার্থে কোরিয়ান কিট দ্বারা সরকার অনুমোদিত একটি সুনির্দিষ্ট কোভিড সেন্টার থেকে টেস্ট শেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ায় গমন নিশ্চিত করতে হবে।

(গ) সকল যাত্রীদের ট্রাভেল বিমার ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

(ঘ) এইচআরডি কোরিয়ার চাহিদা মোতাবেক বিশেষ ফ্লাইটে ইপিএস কর্মী প্রেরণ নিশ্চিত করতে হবে।

(ঙ) ইপিএস কর্মী ছাড়া যারা দক্ষিণ কোরিয়া গমন করবে তাদের তথ্য কোরিয়ান দূতাবাস ঢাকা কর্তৃক বোয়েসেলকে সরবরাহ করতে হবে।

(চ) সঙ্গনিরোধের পূর্বে কোভিড টেস্ট, সঙ্গনিরোধ এবং সঙ্গনিরোধ পরবর্তী কোভিড টেস্টের যাবতীয় ব্যয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বহন করবে। এ বিষয়ে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও দেশে কোয়ারেন্টাইনে রেখে কর্মীদের পাঠানো উচিত। একই সঙ্গে কোরিয়া সরকারের চাহিদা পূরণে সচেষ্ট থাকা জরুরি। আগে থেকে সংশ্লিষ্ট দফতর ও সংস্থা সতর্ক হলে দ্বিতীয় নিষেধাজ্ঞা এড়ানো যেত।

সিউলের একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, গত ১৬ এপ্রিল দ্বিতীয় নিষেধাজ্ঞার পরে কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিতে ২৩ এপ্রিল অনুরোধ জানান রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম।

বিশ্ব কোভিড পরিস্থিতির উপর তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে কোরিয়ার সংশ্লিষ্ট দফতর, একই সঙ্গে বাংলাদেশের কোভিড পরিস্থিতি উপর। তবে বাংলাদেশের কোভিড পরিস্থিতি উন্নতি হলে নিষেধাজ্ঞা উঠানো হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

একই সঙ্গে কোরিয়ার একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়া নিষেধাজ্ঞা উঠানোর বিষয়টি কোরিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শের উপর নির্ভর করছে।

উল্লেখ্য, ভিসা নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বিশেষ ফ্লাইটে গত কয়েক দিনে বাংলাদেশ থেকে কোরিয়াতে আগত যাত্রীদের মধ্যে প্রতিদিন করোনা পজিটিভ শনাক্ত হচ্ছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে এভাবে করোনা রোগী শনাক্ত হলে সহসা ভিসা নিষেধাজ্ঞা বাতিল করবে না কোরীয় কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, দ্বিতীয় নিষেধাজ্ঞার পরে ২৩ এপ্রিল কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে রাষ্ট্রদূত অনুরোধ জানিয়েছেন, যে ১১০০ জন বাংলাদেশির সিসিভিআই ইস্যু হয়েছে তাদেরকে যেন কোরিয়া প্রবেশে সুযোগ দেয়া হয়।

একই সঙ্গে ছুটিতে এসে যে ১৩২ জন স্পেশাল কর্মী কোরিয়া প্রবেশ করতে পারেনি, তাদেরকে যেন প্রবেশে সুযোগ দেয়া হয়। দ্রুততম ভিসা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে অনুরোধ জানানো হয়।

ইপিএস কর্মী মাসুদ রানা বলেন, কোরিয়ায় এসে যাদের করোনা শনাক্ত হচ্ছে অধিকাংশ শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, অন্য ক্যাটাগরির ভিসার। ইদানিং যারা প্রবেশ করেছে তারাও। এতে পুরোদমে প্রভাব পড়ছে ইপিএসের ওপর। বাংলাদেশের ইপিএসকে ধ্বংস থেকে বাঁচানোর অনুরোধ করছি সংশ্লিষ্ট সবাইকে।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: